পৃথিবীর প্রথম ঘটনা! মায়ের গর্ভেই শিশুর ফুসফুসে সফল অস্ত্রোপচার!
![]() |
২৫ সপ্তাহ বয়সী গর্ভস্থ শিশুর শ্বাসনালীর বাধা দূর করার জটিল অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। Ai image |
মায়ের গর্ভেই শিশুর ফুসফুসে সফল অস্ত্রোপচার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগ। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে জন্ম হওয়ার আগেই একজন মুমূর্ষু শিশুকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে।
সম্প্রতি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমনই এক অভাবনীয় বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আমেরিকার একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মায়ের গর্ভে থাকা মাত্র ২৫ সপ্তাহ বয়সী এক শিশুর ফুসফুসের জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। আজ আমরা জানবো সেই রুদ্ধশ্বাস অপারেশনের আদ্যোপান্ত।
মানসিক চাপ কমানোর কার্যকরী উপায়
আরো পড়ুন১. রোগের নাম (CHAOS) যখন আতঙ্কের কারণ হয়: CHAOS কি?
ঘটনাটি শুরু হয় যখন অন্তঃসত্ত্বা এক মায়ের রুটিন আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্টে ধরা পড়ে যে তার গর্ভস্থ শিশুটি একটি বিরল রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় CHAOS (Congenital High Airway Obstruction Syndrome)। এটি এমন এক অবস্থা যেখানে শিশুর শ্বাসনালী কোনো কারণে পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এর ফলে শিশুর ফুসফুস থেকে যে তরল নিঃসৃত হওয়ার কথা, তা বের হতে পারে না। ফলে ফুসফুস অস্বাভাবিক ফুলে ওঠে, হৃৎপিণ্ডের ওপর চাপ পড়ে এবং হার্ট ফেইলিউরের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সাধারণত এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা জন্মের পরপরই মারা যায়।
২. সাহসী সিদ্ধান্ত: বস্টন চিলড্রেন’স হাসপাতালের সেই অপারেশন।
শিশু কাসিয়ানকে (Cassian) বাঁচানোর জন্য বস্টন চিলড্রেন’স হাসপাতাল এবং ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। তারা ঠিক করেন, শিশুটির জন্মের অপেক্ষা না করে মায়ের গর্ভেই তার অপারেশন করা হবে। এই ধরণের অপারেশন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এতে মা এবং শিশু—দুজনের প্রাণই সংকটে পড়তে পারে।
৩. অপারেশনটি যেভাবে করা হলো।
চিকিৎসকরা এই প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন 'ফ্যাটাল ইন্টারভেনশন'। অপারেশনটি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে তার ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
নির্ভুল ম্যাপিং: প্রথমে আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে শিশুর একদম নিখুঁত অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।
অ্যানেশথেসিয়া: বিশেষ পদ্ধতিতে মায়ের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুটিকেও অচেতন করা হয় যাতে অপারেশনের সময় সে নড়াচড়া না করে।
এন্ডোস্কোপিক প্রবেশ: চিকিৎসকরা জরায়ুর একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে অত্যন্ত সরু একটি ক্যামেরা এবং লেজার সরঞ্জাম প্রবেশ করান।
বন্ধ পথ খুলে দেওয়া: মাইক্রো-স্কোপিক যন্ত্রের সাহায্যে শিশুটির শ্বাসনালীর যে অংশটি বন্ধ ছিল, সেখানে একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র বা পথ তৈরি করা হয়। এতে জমে থাকা তরল বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং ফুসফুসের ওপর থেকে চাপ কমে যায়।
গর্ভ সিল করা: অপারেশন শেষ হওয়ার পর চিকিৎসকরা জরায়ুর সেই ছিদ্রটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সিল করে দেন যাতে বাকি সময় শিশুটি স্বাভাবিকভাবে গর্ভেই বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. পরবর্তী ৬ সপ্তাহ এবং কাসিয়ানের জন্ম।
অপারেশনটি সফল হওয়ার পর শিশু কাসিয়ান আরও ৬ সপ্তাহ তার মায়ের নিরাপদ গর্ভেই ছিল। এর ফলে তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়ার সময় পায়। অবশেষে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে কাসিয়ান পৃথিবীর আলো দেখে। যদিও জন্মের পর তাকে কিছুদিন কৃত্রিম অক্সিজেন সাপোর্টে রাখতে হয়েছিল, কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার শ্বাসনালী এখন পুরোপুরি সচল এবং সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে।
৫. কেন এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই সফল অস্ত্রোপচার চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে:
১. আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্মের আগেই অনেক মরণব্যাধি শনাক্ত করা সম্ভব।
২. গর্ভস্থ অবস্থাতেই জটিল অস্ত্রোপচার করে শিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো যায়।
৩. ভবিষ্যতে CHAOS-এর মতো অন্যান্য জন্মগত ত্রুটির চিকিৎসার পথ প্রশস্ত হলো।
উপসংহার: কাসিয়ানের এই গল্পটি কেবল একটি সফল অপারেশনের কাহিনী নয়, এটি মানুষের হার না মানা মানসিকতা এবং বিজ্ঞানের জয়ের গল্প। বস্টন চিলড্রেন’স হাসপাতালের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ বাবা-মায়ের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান যদি এভাবে এগিয়ে যেতে থাকে, তবে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কোনো শিশুকেই জন্মগত ত্রুটি নিয়ে অকালে প্রাণ হারাতে হবে না।
তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স, বস্টন চিলড্রেন’স হাসপাতাল নিউজ রুম।
.webp)