আরব আমিরাতকে গুরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ইরানের।
![]() |
| আবুধাবির শহর। |
ইরান ও আরব আমিরাতের নতুন করে উত্তেজনা:
২০২৬ সালের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও ভূ-খণ্ডে যে যুদ্ধের দামামা বাজছে, তার সাম্প্রতিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ইরান।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখন আরব আমিরাতকে ‘গুঁড়িয়ে’ দেয়ার এক ভয়াবহ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মূলত মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান এই কৌশল গ্রহণ করেছে, যা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
**উত্তেজনার সূত্রপাত ও ফুজাইরা হামলা**
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানি ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান পাল্টা আক্রমণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে এই আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার, ৫ মে। আমিরাতের ফুজাইরা পেট্রোলিয়াম স্থাপনায় একটি শক্তিশালী ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ফুজাইরা মিডিয়া অফিস নিশ্চিত করেছে যে, এই ড্রোন হামলার পর পেট্রোলিয়াম শিল্প এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
যদিও আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে তারা ইরান থেকে ছোড়া ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং চারটি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও এই হামলার ধরন ও তীব্রতা আমিরাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
**তেহরানের ‘গুঁড়িয়ে’ দেয়ার পরিকল্পনা**
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সৌদি আরব ও ওমানকে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা রিয়াদকে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আরব আমিরাতকে তারা পুরোপুরি বিধ্বস্ত বা ‘গুঁড়িয়ে’ দেয়ার পরিকল্পনা করছেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইরান এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আবুধাবি ও রিয়াদের মধ্যকার বিদ্যমান মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিরোধকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরব আমিরাতের বর্তমান কৌশলগত দুর্বলতা ইরানকে আরও আগ্রাসী করে তুলেছে। দেশটি একদিকে ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ছে। এই সুযোগটিই নিতে চাইছে তেহরান।
**ওপেক সংকট ও সৌদি-আমিরাত দূরত্ব**
আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর শক্তিশালী সংগঠন 'ওপেক' (OPEC) থেকে আমিরাতের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা।
দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের যে গভীর জোট ছিল, এই সিদ্ধান্তের ফলে তা চরম তিক্ততার দিকে ধাবিত হয়েছে।
ইরান এই বিরোধের বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, আমিরাতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়া এখন সৌদি ও আমিরাতকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে তাদের মধ্যকার উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে বৃহত্তর আরব ঐক্যের কথা বলা হতো, তা এখন কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
**ইসরাইল-আমিরাত সামরিক মৈত্রী**
ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে আরব আমিরাত এখন ব্যাপকভাবে ইসরাইলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের এই সংকটকালীন সময়ে ইসরাইল আমিরাতকে তাদের অত্যাধুনিক 'লেজার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা' এবং অন্যান্য উন্নত মারণাস্ত্র সরবরাহ করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গুলোর মতে, আমিরাত ও ইসরাইলের এই ঘনিষ্ঠতা ইরানকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তেহরান মনে করছে, আমিরাতের মাটি ব্যবহার করে ইসরাইল তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি বা হামলার ছক কষতে পারে।
অন্যদিকে, আরব আমিরাত ও অন্যান্য কিছু আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে যেন ইরানকে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের মাধ্যমে পঙ্গু করে দেয়া হয়। এই গোপন তৎপরতা প্রকাশিত হওয়ার পর ইরান তাদের পালটা হামলার তালিকায় আমিরাতকে শীর্ষ স্থানে রেখেছে।
**দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া**
যদিও ইরান এখন পর্যন্ত সরাসরি এই হামলাগুলোর দায় স্বীকার করেনি, তবে আঞ্চলিক পরিস্থিতি যুদ্ধের ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মিডল ইস্ট আই-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যদি ৯ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার পূর্ণ প্রস্তুতি আবুধাবির রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান ইতিমধ্যে আমিরাতের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
এই দেশগুলোর বিশাল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক আমিরাতে কর্মরত থাকায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
**ভবিষ্যৎ ফলাফল**
ইরান ও আরব আমিরাতের এই দ্বৈরথ কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রক্সি যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আমিরাতের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, তা কতক্ষণ স্থায়ী হবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
যদি ইরান সত্যি তাদের ‘গুঁড়িয়ে’ দেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র ও ভূ-রাজনীতি চিরতরে বদলে যেতে পারে।
একদিকে ইরানের প্রতিরোধমূলক লড়াই, অন্যদিকে আমিরাতের ইসরাইল-ঘনিষ্ঠ নীতি এবং সৌদি আরবের সাথে দূরত্ব—সব মিলিয়ে এক বিধ্বংসী ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সামনের দিনগুলোতে এই উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বরং তা আরও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে।
**মূল পয়েন্টসমূহ:**
* ফুজাইরা তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
* ওমান ও সৌদি আরবকে ইরানের আগাম বার্তা।
* ওপেক থেকে সরে আসায় সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের অবনতি।
* ইসরাইলি লেজার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ওপর আমিরাতের নির্ভরতা।
* দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের জন্য আবুধাবির আগাম প্রস্তুতি।
.webp)