মানুষের শরীরের একটি হাড় কি কখনো মাটিতে মিশে যায় না? ইসলাম কী বলে

মানুষের মেরুদণ্ডের নিচের অংশ ও আজবুয-যানাব সম্পর্কে প্রতীকী চিত্র
মানুষের মেরুদণ্ডের নিচের অংশ ও আজবুয-যানাব সম্পর্কে প্রতীকী চিত্র


প্রতিবেদক: ProtidinBD

মানুষের মৃত্যুর পর তার দেহ মাটিতে মিশে যায়—এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে দেহের নরম টিস্যু পচে যায় এবং হাড়ও পরিবেশের প্রভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। তবে ইসলামি হাদিসে মানুষের শরীরের একটি বিশেষ অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অংশটির নাম ‘আজবুয-যানাব’।


ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের দেহ মাটিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও এই বিশেষ অংশের মাধ্যমে কিয়ামতের দিন পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। বিষয়টি কীভাবে হাদিসে এসেছে, পবিত্র কোরআনে পুনরুত্থান সম্পর্কে কী বলা হয়েছে এবং এ বিষয়ে বিজ্ঞান কী ব্যাখ্যা দেয়—তা জানা যাক।


**আজবুয-যানাব কী?

‘আজবুয-যানাব’ (عَجْبُ الذَّنَبِ) একটি আরবি শব্দ। হাদিসে মানুষের মেরুদণ্ডের নিচের প্রান্তের একটি বিশেষ অংশ বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদে একে সাধারণত "tailbone" বা "coccyx" বলা হয়।


মানবদেহের মেরুদণ্ডের একেবারে নিচের দিকে ককসিক্স নামে একটি হাড় রয়েছে। তবে হাদিসে উল্লিখিত আজবুয-যানাবকে আধুনিক শারীরবিদ্যার ককসিক্সের সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন বলে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও শারীরবিদ্যার পরিভাষাকে এক করে দেখা ঠিক নয়।


**হাদিসে কী বলা হয়েছে?

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:


“আদমসন্তানের সবকিছু মাটি খেয়ে ফেলবে, শুধু আজবুয-যানাব ছাড়া। তা থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং তা থেকেই তাকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে।”


**সূত্র:** সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৫৫বি।

মূল হাদিস: https://sunnah.com/muslim/54/176


সহিহ বুখারিতেও এ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষের দেহের সবকিছু ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, আজবুয-যানাব ছাড়া। সেই অংশ থেকেই কিয়ামতের দিন মানুষের পুনর্গঠন হবে।


**সূত্র:** সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৮১৪।

মূল হাদিস: https://sunnah.com/bukhari/65/336


এই বর্ণনাগুলো ইসলামি বিশ্বাসে মানুষের মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।


** কিয়ামতের দিন মানুষকে কীভাবে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে?

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো আখিরাত ও কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান। অর্থাৎ, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের অস্তিত্বের পার্থিব অধ্যায় শেষ হলেও আল্লাহর কাছে তার হিসাবের বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না।


সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, দুইবার শিঙায় ফুঁ দেওয়ার মধ্যবর্তী সময় সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্দিষ্ট সময় জানাননি। একই বর্ণনায় পুনরুত্থানের প্রসঙ্গে মানুষের দেহের বিশেষ অংশটির কথা উল্লেখ রয়েছে।


হাদিসের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন। ইসলামি বিশ্বাসে আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির কাছে মানুষের দেহকে পুনর্গঠন করা অসম্ভব নয়।


এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাদিসটি পুনরুত্থানের কথা বলছে। এটি মানুষের মৃত্যুর পর দেহের প্রতিটি অংশের ক্ষয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরীক্ষাগারভিত্তিক কোনো বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন নয়।


** পবিত্র কোরআনে পচে যাওয়া হাড়ের প্রসঙ্গ

মানুষের পুনরুত্থান নিয়ে সংশয় প্রকাশের একটি ঘটনা পবিত্র কোরআনের সুরা ইয়াসিনে উল্লেখ রয়েছে।


আল্লাহ তাআলা বলেন, একজন মানুষ নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে গিয়ে প্রশ্ন করে, পচে যাওয়া হাড়কে কে আবার জীবিত করবে? এর উত্তরে বলা হয়েছে, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তা পুনরায় জীবিত করবেন। তিনি সব ধরনের সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত।


"সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৭৮–৭৯।"


কোরআনের এই আয়াতগুলোর মূল বক্তব্য হলো, মানুষের প্রথম সৃষ্টি যেমন আল্লাহর ক্ষমতায় সম্ভব হয়েছে, তেমনি মৃত্যুর পর পুনরুত্থানও তাঁর ক্ষমতার বাইরে নয়।


লক্ষ করার বিষয়, এই আয়াতগুলোতে আজবুয-যানাবের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। নির্দিষ্ট অংশটির বিষয়ে তথ্যটি এসেছে হাদিসে।


** বিজ্ঞান কি প্রমাণ করেছে যে এই হাড় কখনো নষ্ট হয় না?

এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি।


বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের হাড়ে খনিজ পদার্থ ও জৈব উপাদান থাকে। মৃত্যুর পর পরিবেশের প্রভাবে হাড়ের উপাদানগুলোও পরিবর্তিত হতে পারে। মাটির অম্লতা, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থার ওপর হাড়ের সংরক্ষণ ও ক্ষয়ের গতি নির্ভর করে।


প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বহু প্রাচীন মানুষের হাড় ও কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, অনুকূল পরিবেশে হাড় দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। তবে সব পরিবেশে কোনো নির্দিষ্ট হাড় কখনোই ক্ষয় হবে না—এমন সিদ্ধান্ত সাধারণ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতিষ্ঠিত নয়।


অন্যদিকে, হাদিসে আজবুয-যানাব সম্পর্কে যে বক্তব্য এসেছে, তা মুসলিমদের কাছে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য একটি বিষয়। কিন্তু এই বক্তব্যকে আধুনিক পরীক্ষাগারে প্রমাণিত দাবি হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য আলাদা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।


তাই ‘বিজ্ঞান ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে মানুষের এই হাড় কখনো পচে না’—এমন দাবি সতর্কতা ছাড়া করা উচিত নয়।


** তাহলে কি মানুষের শরীরের একটি হাড় কখনোই মাটিতে মিশে যায় না?

ইসলামি হাদিসের বক্তব্য অনুযায়ী, আজবুয-যানাব বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন এবং কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। মুসলিমরা এ বিষয়ে হাদিসের বর্ণনায় বিশ্বাস করেন।


তবে হাদিসের বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা কোনো পরীক্ষার ফল হিসেবে বর্ণনা করা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে তুলে ধরা এক বিষয় নয়। দুটিকে আলাদা রেখে আলোচনা করাই যথাযথ।


**এই আলোচনা থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

ইসলামি বিশ্বাসে মৃত্যু মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়। বরং মৃত্যুর পর আখিরাতের জীবন এবং কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান রয়েছে। আজবুয-যানাব সম্পর্কিত হাদিসও সেই পুনরুত্থানের বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত।


এই বিষয়টি মানুষকে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, নিজের কাজের জবাবদিহি এবং পরকালের প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।


উপসংহার: মানুষের দেহের একটি বিশেষ অংশ সম্পর্কে সহিহ হাদিসে পুনরুত্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে। ইসলামি দৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিশ্বাস। তবে মানুষের কোনো হাড় সব ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশে কখনোই ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না—এমন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত বলে দাবি করা ঠিক নয়। ধর্মীয় বক্তব্যকে তার নিজস্ব প্রেক্ষাপটে এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যকে প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করাই দায়িত্বশীল পদ্ধতি।


--

**তথ্যসূত্র**


১. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৫৫বি — https://sunnah.com/muslim/54/176


২. সহিহ বুখারি, হাদিস ৪৮১৪ — https://sunnah.com/bukhari/65/336


৩. পবিত্র কোরআন, সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৭৮–৭৯ — https://quran.com/36/78-79