তুরস্কে নূহ (আ.)-এর নৌকার সন্ধান, নতুন তদন্তে কী মিলল?

তুরস্কের দুরুপিনার ফরমেশনে নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য সন্ধানে গবেষকদের অনুসন্ধান।
তুরস্কে নূহ (আ.)-এর নৌকার রহস্য নিয়ে নতুন গবেষণা: প্রতীকী ছবি


**প্রতিবেদন | ২৭ অক্টোবর ২০২৬**

তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থিত নৌকাসদৃশ একটি ভূপ্রাকৃতিক গঠন ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানটি হজরত নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে। এবার সেখানে মাটির নিচে কী রয়েছে, তা জানতে ড্রিলিং, রাডার স্ক্যান ও মাটির নমুনা পরীক্ষা করেছেন গবেষকেরা। তবে এখন পর্যন্ত নূহ (আ.)-এর নৌকার অস্তিত্ব নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


**মাটির নিচে কী খুঁজছেন গবেষকেরা?

তুরস্কের আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকার কাছে অবস্থিত স্থানটি ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ নামে পরিচিত। ওপর থেকে দেখলে এর আকৃতি অনেকটা বিশাল নৌকার মতো মনে হয়। এই অস্বাভাবিক আকৃতির কারণেই কয়েক দশক ধরে স্থানটি গবেষক, ইতিহাস অনুসন্ধানী ও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে।


২০২৬ সালে তুরস্কের সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সেনকার আতিলা এবং নোয়াহস আর্ক স্ক্যানস (Noah’s Ark Scans) প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা স্থানটি নিয়ে নতুন অনুসন্ধান শুরু করেন।


গবেষণায় ভূগর্ভস্থ রাডার, ত্রিমাত্রিক মানচিত্র এবং ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে মাটির নিচের গঠন পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, সেখানে কোনো মানবসৃষ্ট কাঠামো বা কাঠের অবশেষ রয়েছে কি না, নাকি পুরো গঠনটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে, তা বোঝা।


** ড্রিলিংয়ে মিলেছে কী?

২০২৬ সালের গবেষণা মৌসুমে গঠনটির ভেতরে ১২টি এবং বাইরে চারটি স্থানে ড্রিলিং করা হয় বলে "The Jerusalem Post"-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কয়েকটি স্থানে প্রায় ২০ মিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়।


প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রিলিংয়ের সময় এসব স্থানে শক্ত শিলাস্তরের সন্ধান মেলেনি। তবে এটিকে নূহ (আ.)-এর নৌকার অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মাটির নিচের প্রকৃত গঠন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।


গবেষকেরা সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছেন। এসব নমুনায় জৈব পদার্থ, সম্ভাব্য কাঠের অবশেষ এবং আশপাশের মাটির সঙ্গে গঠনের রাসায়নিক পার্থক্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।


** রাডার স্ক্যানে দেখা গেছে অস্বাভাবিক সংকেত

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূগর্ভস্থ রাডার স্ক্যান। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা জানান, স্ক্যানে কিছু সরলরেখার মতো বৈশিষ্ট্য, কোণাকুণি সংযোগ এবং ফাঁকা স্থানের সম্ভাব্য সংকেত দেখা গেছে।


তাঁদের কেউ কেউ এসব সংকেতকে ভূগর্ভস্থ কক্ষ বা করিডরের মতো কাঠামোর সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে রাডারে দেখা এমন সংকেত থেকেই কোনো কাঠামো মানুষের তৈরি, কিংবা সেটি কোনো প্রাচীন নৌকা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।


ভূতাত্ত্বিক স্তর, শিলার ফাটল, মাটির আর্দ্রতা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য থেকেও এ ধরনের সংকেত তৈরি হতে পারে। তাই এসব পর্যবেক্ষণকে এখনো প্রাথমিক ফলাফল হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।


** কেন নূহ (আ.)-এর নৌকার সঙ্গে স্থানটির নাম জড়িয়েছে?

১৯৫৯ সালে তুরস্কের সেনা কর্মকর্তা ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা ছবিতে স্থানটির অস্বাভাবিক আকৃতি শনাক্ত করেন। পরে এর নৌকাসদৃশ অবয়ব নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে।


ধর্মীয় বর্ণনায় নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন ও নৌকার কথা উল্লেখ থাকায় কিছু গবেষক ও অনুসন্ধানী গোষ্ঠী স্থানটির সঙ্গে সেই ঘটনার সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তবে কোনো ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে ভৌগোলিক আকৃতির মিল থাকলেই প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে সেই পরিচয় নিশ্চিত হয় না।


উল্লেখ্য, দুরুপিনার ফরমেশন আরারাত পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়ার ঠিক ওপর অবস্থিত নয়; এটি চূড়া থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণে।


** বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?

এই স্থান নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কিছু গবেষক নতুন নমুনা পরীক্ষা ও ভূগর্ভস্থ জরিপকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। অন্যদিকে, পূর্ববর্তী ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় স্থানটির নৌকাসদৃশ আকৃতিকে প্রাকৃতিক শিলাগঠন, ক্ষয় এবং ভূমির পরিবর্তনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।


২০২৬ সালের নতুন অনুসন্ধানের নমুনা পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে। "The Jerusalem Post"-এর ২২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পরবর্তী মৌসুমে ২০২৭ সালে আবারও গবেষণা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।


তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নমুনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, ফলাফলের স্বাধীন যাচাই এবং প্রয়োজনে সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণা প্রকাশ জরুরি।


** রহস্যের সমাধান কি এবার হবে?

দুরুপিনার ফরমেশনকে ঘিরে নতুন গবেষণা প্রাচীন ইতিহাস ও ভূতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুসন্ধান। কিন্তু এখন পর্যন্ত নূহ (আ.)-এর নৌকার সন্ধান পাওয়ার দাবি প্রমাণিত হয়নি।


আগামী দিনের পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ও আরও অনুসন্ধান হয়তো মাটির নিচের অস্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে। সেই ফলাফল না আসা পর্যন্ত স্থানটিকে নূহ (আ.)-এর নৌকার নিশ্চিত অবস্থান হিসেবে বর্ণনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়।


**তথ্যসূত্র:** The Jerusalem Post, ২২ অক্টোবর ২০২৬; IFLScience, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬।