সৌরজগতের বাইরে বিশাল চাঁদসদৃশ বস্তুর সন্ধান, নতুন সম্ভাবনায় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা

 

Artist illustration of a possible Jupiter-mass exosatellite orbiting a brown dwarf in the CD-35 2722 star system.
“প্রতীকী ছবি”


তথ্যসূত্র: ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO) এবং Nature সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা।


পৃথিবী থেকে প্রায় ৭০ আলোকবর্ষ দূরে একটি নক্ষত্রব্যবস্থায় বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের একটি চাঁদসদৃশ বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। বস্তুটি সরাসরি কোনো নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে না; বরং একটি বাদামি বামনকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। আর সেই বাদামি বামনটি আবার একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে।


এই আবিষ্কার সৌরজগতের বাইরে উপগ্রহের অস্তিত্ব অনুসন্ধানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে গবেষকেরা এখনই বস্তুটিকে নিশ্চিতভাবে ‘এক্সোমুন’ বা বহির্জাগতিক চাঁদ হিসেবে ঘোষণা করছেন না। কারণ এর ভর ও যে বস্তুকে এটি প্রদক্ষিণ করছে, তার প্রকৃতি প্রচলিত গ্রহ-উপগ্রহের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।


** কোথায় পাওয়া গেছে এই চাঁদসদৃশ বস্তু?


গবেষণায় আলোচিত নক্ষত্রব্যবস্থাটির নাম CD-35 2722। এটি পৃথিবী থেকে আনুমানিক ৭০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।


এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে CD-35 2722 A নামের একটি নক্ষত্র, যার ভর সূর্যের প্রায় অর্ধেক। নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করছে CD-35 2722 B নামের একটি বাদামি বামন। এর ভর বৃহস্পতির ৩০ গুণেরও বেশি।


গবেষকেরা এই বাদামি বামনকে ঘিরে আরও একটি বিশাল বস্তুর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন। বস্তুটির সর্বনিম্ন ভর বৃহস্পতির প্রায় ০.৯ গুণ এবং এটি প্রায় ১৭০ দিনে একবার বাদামি বামনটিকে প্রদক্ষিণ করে।


অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটি তিন স্তরে সাজানো—প্রথমে একটি নক্ষত্র, তাকে প্রদক্ষিণ করছে একটি বাদামি বামন, আর সেই বাদামি বামনকে প্রদক্ষিণ করছে আরেকটি বিশাল বস্তু।


** কেন বস্তুটিকে চাঁদ বলা নিয়ে বিতর্ক?


সাধারণভাবে আমরা চাঁদ বলতে এমন প্রাকৃতিক উপগ্রহকে বুঝি, যা কোনো গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘোরে। যেমন পৃথিবীর চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং বৃহস্পতির রয়েছে একাধিক প্রাকৃতিক উপগ্রহ।


কিন্তু CD-35 2722 ব্যবস্থায় পাওয়া বস্তুটি কোনো প্রচলিত গ্রহকে প্রদক্ষিণ করছে না। এটি প্রদক্ষিণ করছে একটি বাদামি বামনকে।


বাদামি বামন হলো এমন এক ধরনের মহাজাগতিক বস্তু, যা সাধারণ গ্রহের চেয়ে অনেক বেশি ভারী, কিন্তু নক্ষত্রের মতো স্থায়ী হাইড্রোজেন নিউক্লীয় সংযোজন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট ভরসম্পন্ন নয়। এ কারণে একে অনেক সময় গ্রহ ও নক্ষত্রের মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্যের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


অন্যদিকে, নতুন শনাক্ত বস্তুটির ভর বৃহস্পতির কাছাকাছি। ফলে এটি আকার ও ভরের দিক থেকে একটি গ্যাসীয় গ্রহের মতো। কিন্তু এটি কোনো নক্ষত্রকে সরাসরি প্রদক্ষিণ করছে না।


এই জটিলতার কারণে গবেষকেরা আপাতত একে ‘এক্সোস্যাটেলাইট’ বলছেন। শব্দটির অর্থ সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত কোনো প্রাকৃতিক উপগ্রহ। এটি সত্যিকার অর্থে চাঁদ, নাকি গ্রহসদৃশ কোনো উপগ্রহ—তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।


** কীভাবে সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা?


এই আবিষ্কারে ব্যবহার করা হয়েছে ‘রেডিয়াল ভেলোসিটি’ (Radial Velocity) নামের একটি পদ্ধতি। বহির্গ্রহ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছেন।


কোনো বড় বস্তু যখন অন্য একটি বস্তুকে প্রদক্ষিণ করে, তখন তার মহাকর্ষীয় টানে কেন্দ্রীয় বস্তুটির অবস্থানে সামান্য নড়াচড়া বা দোলন তৈরি হয়। পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণ করলে কেন্দ্রীয় বস্তুর আলোয় ডপলার প্রভাবের কারণে নির্দিষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। এই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রদক্ষিণকারী বস্তুর সম্ভাব্য অস্তিত্ব, ভর ও কক্ষপথ সম্পর্কে ধারণা পান।


গবেষক দল চিলিতে অবস্থিত ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির (ESO) ভেরি লার্জ টেলিস্কোপে (VLT) সংযুক্ত CRIRES+ যন্ত্র ব্যবহার করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাদামি বামনটির বর্ণালি পর্যবেক্ষণ করা হয়।


পর্যবেক্ষণের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রায় ১৭০ দিনের একটি পর্যায়ক্রমিক সংকেত পাওয়া যায়, যা বাদামি বামনটিকে প্রদক্ষিণকারী একটি বস্তুর উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


** আমাদের চাঁদের তুলনায় কত বড়?


এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো বস্তুটির ভর। এর সর্বনিম্ন ভর বৃহস্পতির প্রায় ০.৯ গুণ বলে গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে।


তুলনা করলে দেখা যায়, বৃহস্পতির সবচেয়ে বড় উপগ্রহ গ্যানিমিডের ভর বৃহস্পতির ভরের মাত্র প্রায় ২.৫ শতাংশ। অথচ নতুন শনাক্ত বস্তুটির ভর বৃহস্পতির প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি।


অর্থাৎ এটি আমাদের পরিচিত চাঁদ বা সৌরজগতের অধিকাংশ প্রাকৃতিক উপগ্রহের তুলনায় অত্যন্ত বিশাল।


তবে মনে রাখতে হবে, বস্তুটির প্রকৃত ভর আরও বেশি হতে পারে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, কক্ষপথের অবস্থান ও প্রবণতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ায় এর প্রকৃত ভর নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।


** এটি কি সৌরজগতের বাইরের প্রথম চাঁদ?


এখনই নিশ্চিতভাবে তা বলা যাচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা এর আগে সৌরজগতের বাইরের সম্ভাব্য কয়েকটি উপগ্রহের প্রার্থী শনাক্ত করার দাবি পেয়েছেন। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত হয়নি।


CD-35 2722 ব্যবস্থার নতুন আবিষ্কারটি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ এটি বাদামি বামনকে প্রদক্ষিণকারী একটি উপগ্রহসদৃশ বস্তুর পক্ষে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণভিত্তিক প্রমাণ দিয়েছে।


গবেষণার লেখকেরাও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বস্তুটি এক্সোমুনের সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণ এবং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এর প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হতে পারে।


** মহাকাশ গবেষণায় কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?


এত দিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মূলত সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট খুঁজে বের করার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত ছয় হাজারেরও বেশি এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে কোনো এক্সোমুন শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।


এই নতুন গবেষণা দেখিয়েছে, গ্রহ অনুসন্ধানে ব্যবহৃত রেডিয়াল ভেলোসিটি পদ্ধতি বাদামি বামনের চারপাশে থাকা উপগ্রহসদৃশ বস্তুর সন্ধানেও কাজে লাগতে পারে।


ভবিষ্যতে আরও এমন বস্তু শনাক্ত করা গেলে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন, গ্রহ ও বাদামি বামনের চারপাশে কীভাবে উপগ্রহ তৈরি হয়, তাদের কক্ষপথ কতটা স্থিতিশীল থাকে এবং মহাবিশ্বে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা সাধারণ।


সব মিলিয়ে, CD-35 2722 ব্যবস্থার এই আবিষ্কার মহাকাশ গবেষণায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বস্তুটি সত্যিকার অর্থে চাঁদ, নাকি গ্রহের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কোনো বিশাল উপগ্রহ—তার উত্তর পেতে বিজ্ঞানীদের আরও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। তবে সৌরজগতের বাইরে প্রাকৃতিক উপগ্রহ খোঁজার প্রচেষ্টায় এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।