সাদা চুল আবার কালো হতে পারে? নতুন গবেষণায় মিলল আশার ইঙ্গিত

সাদা ও কালো চুলের তুলনামূলক ছবি এবং চুলের রং নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা
সাদা চুল আবার কালো হওয়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতীকী ছবি:

প্রতিবেদন: ProtidinBD স্বাস্থ্য ডেস্ক

 বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল পেকে যাওয়া স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। তবে অল্প বয়সে চুল সাদা হয়ে গেলে অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে সাদা চুল আবার কালো হতে পারে কি না, তা নিয়ে মানুষের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো এ বিষয়ে নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে চুলের হারানো রং আবার ফিরে আসতে পারে। তবে সব পাকা চুল কালো করার নিশ্চিত চিকিৎসা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


** সাদা চুল আবার কালো হওয়ার প্রমাণ মিলেছে গবেষণায়


২০২১ সালের ২২ জুন *eLife* সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মানুষের চুলের রং পরিবর্তনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাটির নাম ছিল *Quantitative mapping of human hair greying and reversal in relation to life stress*।


গবেষকেরা মানুষের চুলের বিভিন্ন অংশে রঞ্জকতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, কিছু চুলে রং হারানোর পর আবার রং ফিরে আসতে পারে। অর্থাৎ, চুল পাকার প্রক্রিয়া সব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় নয়।


গবেষণায় আরও দেখা যায়, কিছু অংশগ্রহণকারীর চুলের রং পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁদের জীবনের মানসিক চাপের ওঠানামার সম্পর্ক ছিল। তবে এই ফলাফল থেকে বলা যায় না যে মানসিক চাপ কমালেই সবার সাদা চুল আবার কালো হয়ে যাবে।


গবেষণাটি মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়—কিছু পরিস্থিতিতে চুলের রং পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আংশিকভাবে উল্টে যেতে পারে।


** চুল সাদা হয় কেন?


চুলের স্বাভাবিক কালো, বাদামি কিংবা অন্য রঙের পেছনে রয়েছে মেলানিন নামের একটি রঞ্জক পদার্থ। চুলের গোড়ার ফলিকলে থাকা মেলানোসাইট নামের বিশেষ কোষ এই রঞ্জক তৈরি করে।


বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব কোষের কার্যক্ষমতা কমতে পারে। ফলে চুলে মেলানিনের পরিমাণ কমে যায় এবং চুল ধীরে ধীরে ধূসর বা সাদা হয়ে ওঠে।


চুল পাকার পেছনে কয়েকটি বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন—


 "বংশগত বৈশিষ্ট্য": পরিবারের সদস্যদের অল্প বয়সে চুল পাকার প্রবণতা থাকলে অন্যদের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।

 "বয়স": বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে চুলের রঞ্জক তৈরির ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

"অক্সিডেটিভ ক্ষতি": কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত অক্সিডেটিভ চাপ চুলের রঞ্জক তৈরির ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

"পুষ্টির ঘাটতি ও কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা": নির্দিষ্ট পুষ্টির ঘাটতি বা থাইরয়েডের সমস্যার মতো কিছু পরিস্থিতি চুলের রঙের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।


তবে সব মানুষের চুল একই কারণে বা একই বয়সে পাকে না।


** মানসিক চাপ কমলে কি চুলের রং ফিরে আসতে পারে?


২০২১ সালের গবেষণাটি এ বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। গবেষকেরা কিছু মানুষের চুলে রং হারানো এবং পরে রং ফিরে পাওয়ার নিদর্শন শনাক্ত করেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন মানসিক চাপের ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।


বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, কিছু পরিস্থিতিতে চুলের রঞ্জক তৈরির ব্যবস্থা সাময়িকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে গবেষণাটি সীমিতসংখ্যক মানুষের চুলের ওপর করা হয়েছিল এবং এতে মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে সাদা চুল কালো করার চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়নি।


তাই মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো পাকা চুল কালো করার প্রমাণিত পদ্ধতি নয়।


** ২০২৬ সালের গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা


চুলের রং ফিরিয়ে আনার গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দেখা যায় ২০২৬ সালে। *ACS Nano* সাময়িকীতে ৮ এপ্রিল প্রকাশিত *Direct Activation of Follicular Melanocytes by Polymeric Tyrosinase Nanocapsules for Reversing Hair Graying* শিরোনামের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষ ন্যানোক্যাপসুল ব্যবহার করে চুলের রঞ্জক তৈরির প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করার পদ্ধতি পরীক্ষা করেন।


এ পদ্ধতিতে টাইরোসিনেজ নামের একটি এনজাইমকে পলিমারভিত্তিক ন্যানোক্যাপসুলে আবদ্ধ করে চুলের ফলিকলে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করা হয়। টাইরোসিনেজ মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


গবেষণাটিতে পরীক্ষাগারে মানুষের মেলানোসাইট, মানুষের ত্বকের মডেল এবং প্রাণীর মডেলে পদ্ধতিটির সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল চুলের রং ফিরিয়ে আনার ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য নতুন পথ দেখিয়েছে।


তবে এই গবেষণাকে মানুষের সাদা চুল কালো করার প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।


** সাদা চুল কালো করার তেল বা ওষুধ কি কার্যকর?


বাজারে বিভিন্ন ধরনের তেল, শ্যাম্পু, সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ পাওয়া যায়, যেগুলোর বিজ্ঞাপনে পাকা চুল কালো করার দাবি করা হয়। কিন্তু এসব পণ্যের সবগুলোর কার্যকারিতার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।


চুলে তেল ব্যবহার করলে চুল নরম ও পরিচর্যাযুক্ত থাকতে পারে, কিন্তু তেল ব্যবহারে চুলের গোড়ায় মেলানিন উৎপাদন আবার শুরু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।


একইভাবে, ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে তা পূরণ করা উপকারী হতে পারে। কিন্তু ঘাটতি না থাকলে অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে সাদা চুল কালো হবে, এমন প্রমাণ নেই।


অতএব, কোনো পণ্য কেনার আগে তার উপাদান, কার্যকারিতার প্রমাণ এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।


** অল্প বয়সে চুল পেকে গেলে কী করবেন?


অল্প বয়সে কয়েকটি চুল সাদা হওয়া মানেই গুরুতর কোনো রোগ হয়েছে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে বংশগত কারণেই চুল আগে পাকতে পারে। তবে অল্প বয়সে হঠাৎ অনেক চুল সাদা হয়ে গেলে বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।


প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ভিটামিন B12-এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ যাচাই করতে পারেন। পরীক্ষা ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।


পাশাপাশি সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক।


** ভবিষ্যতে কি পাকা চুল কালো করার চিকিৎসা আসতে পারে?


বর্তমান গবেষণা বলছে, চুল পাকার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা আগের চেয়ে বেশি জানতে পারছেন। কিছু মানুষের চুলে স্বাভাবিকভাবে রং ফিরে আসার পর্যবেক্ষণ এবং ন্যানোক্যাপসুলভিত্তিক পরীক্ষামূলক গবেষণা ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।


তবে চুলের রং ফিরিয়ে আনার পদ্ধতি তৈরি করতে হলে চুলের ফলিকলের কোষগুলোকে কীভাবে নিরাপদে সক্রিয় করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসার কার্যকারিতা কত দিন স্থায়ী হয় এবং এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।


** শেষ কথা


সাদা চুল আবার কালো হতে পারে কি না, তার উত্তর এককথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কিছু চুলের স্বাভাবিক রং ফিরে আসার প্রমাণ পাওয়া গেছে। নতুন প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে বয়সজনিত পাকা চুল স্থায়ীভাবে কালো করার নিরাপদ ও নিশ্চিত চিকিৎসা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


তাই সাদা চুল কালো করার অবাস্তব দাবি বা অপ্রমাণিত পণ্যের ওপর নির্ভর না করে, চুল পাকার সম্ভাব্য কারণ বোঝা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ।


*** তথ্যসূত্র:

১. *eLife* (২০২১): [Quantitative mapping of human hair greying and reversal in relation to life stress](https://elifesciences.org/articles/67437)


২. *ACS Nano* (২০২৬): [Direct Activation of Follicular Melanocytes by Polymeric Tyrosinase Nanocapsules for Reversing Hair Graying](https://doi.org/10.1021/acsnano.5c21788)