![]() |
| প্রতীকী ছবি। |
ঘূর্ণিঝড়ের নাম কি ইচ্ছামতো রাখা হয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম? কেন কোনো ঝড়ের নাম হয় রেমাল, কোনোটি মোচা, আবার কোনোটি বিপর্যয়? বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের পদ্ধতি, বাংলাদেশের অবদান এবং নাম নির্বাচনের নিয়ম সম্পর্কে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কেন করা হয়?
প্রকৃতিতে ঘূর্ণিঝড় একটি শক্তিশালী আবহাওয়াজনিত ঘটনা। এটি উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টিপাত, জলোচ্ছ্বাস ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। একটি অঞ্চলে একাধিক ঝড় সৃষ্টি হলে সেগুলোকে শুধু তারিখ বা আবহাওয়াবিষয়ক সংখ্যা দিয়ে শনাক্ত করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে ঘূর্ণিঝড়ের আলাদা নাম ব্যবহার করা হয়। নাম থাকলে আবহাওয়াবিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মী, সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ সহজে নির্দিষ্ট ঝড়টি শনাক্ত করতে পারেন। একই সঙ্গে ঝড়ের গতিপথ, সতর্কবার্তা ও সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে দ্রুত তথ্য প্রচার করা সহজ হয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্য আদান-প্রদান সহজ করা এবং একই সময়ে একাধিক ঝড়ের কারণে সৃষ্ট বিভ্রান্তি কমানো।
কোন সংস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্ধারণ করে?
বিশ্বের সব ঘূর্ণিঝড়ের নাম একটি মাত্র সংস্থা নির্ধারণ করে না। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নির্ধারিত আঞ্চলিক আবহাওয়া সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে নামকরণের ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর। এই দুই অঞ্চলে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে ভারতের নয়াদিল্লিভিত্তিক আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র (RSMC New Delhi), যা ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের অধীন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ESCAP) আওতাধীন ঘূর্ণিঝড়বিষয়ক প্যানেলের মাধ্যমে এ অঞ্চলের নামকরণের নীতিমালা সমন্বয় করা হয়।
২০০০ সালে ওমানের মাসকাটে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে, ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘূর্ণিঝড়ের নাম ব্যবহার শুরু হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয় যে ১৩টি দেশ
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকা তৈরিতে মোট ১৩টি দেশ অংশগ্রহণ করে। দেশগুলো হলো—
১. বাংলাদেশ
২. ভারত
৩. ইরান
৪. মালদ্বীপ
৫. মিয়ানমার
৬. ওমান
৭. পাকিস্তান
৮. কাতার
৯. সৌদি আরব
১০. শ্রীলঙ্কা
১১. থাইল্যান্ড
১২. সংযুক্ত আরব আমিরাত
১৩. ইয়েমেন।
প্রতিটি দেশ তালিকায় ব্যবহারের জন্য একাধিক নাম প্রস্তাব করে। প্রস্তাবিত নামগুলো নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পর্যালোচনা করে তালিকাভুক্ত করা হয়।
২০২০ সালের মে মাসে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা নতুন তালিকার কথা জানায়। এতে ১৩টি দেশের প্রস্তাবিত মোট ১৬৯টি নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতিটি দেশের জন্য ১৩টি করে নাম রাখা হয়।
কীভাবে একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্বাচন করা হয়?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়।
প্রথম ধাপ: দেশগুলো নাম প্রস্তাব করে।
প্রতিটি সদস্যদেশ নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে সম্ভাব্য নাম জমা দেয়। নামের সঙ্গে উচ্চারণসহ প্রয়োজনীয় তথ্যও দিতে হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রস্তাবিত নাম যাচাই করা হয়।
নামটি সংক্ষিপ্ত, সহজে উচ্চারণযোগ্য এবং বিভিন্ন ভাষায় গ্রহণযোগ্য কি না, তা বিবেচনা করা হয়। নামটি কোনো ধর্ম, সংস্কৃতি, জনগোষ্ঠী বা দেশের অনুভূতিতে আঘাত করে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় ধাপ: নামের তালিকা তৈরি হয়।
অনুমোদিত নামগুলো দেশভিত্তিক তালিকায় সাজানো হয়। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নামগুলো নির্ধারিত ক্রমানুসারে ব্যবহার করা হয়।
চতুর্থ ধাপ: ঝড় নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছালে নাম দেওয়া হয়।
কোনো আবহাওয়াব্যবস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নির্ধারিত তীব্রতায় পৌঁছালে আঞ্চলিক কেন্দ্র তালিকার পরবর্তী প্রযোজ্য নামটি বরাদ্দ করে।
অর্থাৎ, কোনো ঝড়ের নাম দেওয়ার জন্য সেটি কোনো দেশের উপকূলে আঘাত হানা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। ঝড়টি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করলেই নামকরণ করা হতে পারে।
📚 আরও পড়ুন
নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী কী নিয়ম মানা হয়?
নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে।
- নাম সংক্ষিপ্ত ও সহজে উচ্চারণযোগ্য হতে হবে।
- নামের অর্থ বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
- নাম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস বা কোনো জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারবে না।
- নাম অশোভন, অপমানজনক বা নিষ্ঠুর অর্থবোধক হওয়া যাবে না।
- প্রস্তাবিত নামের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য আটটি ইংরেজি অক্ষর হওয়ার নিয়ম রয়েছে।
- নামের উচ্চারণ ও প্রয়োজনীয় ঘোষণার তথ্য দিতে হয়।
- একবার ব্যবহৃত নাম পুনরায় ব্যবহার করা হয় না।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নামের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক প্যানেল প্রয়োজন হলে কোনো নাম প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
বাংলাদেশ কী কী ঘূর্ণিঝড়ের নাম দিয়েছে?
বাংলাদেশও ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। দেশের প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘নিসর্গ’, ‘বিপর্যয়’, ‘অর্ণব’ ও ‘উপকূল’। পরবর্তী নামের তালিকায় রয়েছে ‘বর্ষণ’, ‘রজনী’, ‘নিশীথ’, ‘উর্মি’, ‘মেঘলা’, ‘সমীরণ’, ‘প্রতিকূল’, ‘সরোবর’ ও ‘মহানিশা’সহ আরও কয়েকটি নাম।
তবে কোনো নাম বাংলাদেশের প্রস্তাবিত হলেই সেই ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানবে, এমন নয়। বঙ্গোপসাগর বা আরব সাগরে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করা ঝড়ের ক্ষেত্রে তালিকা অনুযায়ী নাম ব্যবহার করা হয়। ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ ও কোথায় আঘাত হানতে পারে, তা আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
‘রেমাল’, ‘মোচা’ ও ‘বিপর্যয়’ নামের উৎস কী?
বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়ের নাম বিভিন্ন দেশের প্রস্তাবিত তালিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।
- রেমাল (Remal): ওমানের প্রস্তাবিত নাম।
- মোচা (Mocha): ইয়েমেনের প্রস্তাবিত নাম।
- বিপর্যয় (Biparjoy): বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নাম।
- নিসর্গ (Nisarga): বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নাম।
- গতি (Gati): ভারতের প্রস্তাবিত নাম।
- ডানা (Dana): কাতারের প্রস্তাবিত নাম।
- জাওয়াদ (Jawad): সৌদি আরবের প্রস্তাবিত নাম।
এই নামগুলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রস্তাবিত তালিকা থেকে নেওয়া হলেও ঘূর্ণিঝড়টি কোন দেশে আঘাত হানবে, তার সঙ্গে নামদাতা দেশের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
ঘূর্ণিঝড়ের নাম কি আবার ব্যবহার করা হয়?
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একবার কোনো নাম ব্যবহার করা হলে সেটি আর নতুন ঘূর্ণিঝড়ের জন্য ব্যবহার করা হয় না। অর্থাৎ, নামটি ব্যবহারের পর তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়।
তবে পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বিভিন্ন অঞ্চলের নামকরণের নীতিমালা আলাদা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলে নামের তালিকা পর্যায়ক্রমে আবার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কোনো ঝড় বিশেষভাবে প্রাণঘাতী বা ব্যাপক ধ্বংসাত্মক হলে তার নাম অবসর দেওয়া হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে একই নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের নামের সঙ্গে কি ঝড়ের শক্তির সম্পর্ক আছে?
না। ঘূর্ণিঝড়ের নাম তার শক্তি, গতি বা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে না। একটি নাম শুনে ঝড় কতটা শক্তিশালী হবে, তা বোঝার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ঝড়ের প্রকৃত বিপদ নির্ভর করে বাতাসের গতিবেগ, বৃষ্টিপাত, জলোচ্ছ্বাস, গতিপথ, স্থলভাগে আঘাতের স্থান এবং স্থানীয় ভৌগোলিক পরিস্থিতির ওপর। তাই নামের চেয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা, সংকেত ও নির্দেশনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ঘূর্ণিঝড়ের নাম জানার পাশাপাশি কী করা উচিত?
ঘূর্ণিঝড়ের নাম জানা তথ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিপদের সময় প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
১. আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ সতর্কবার্তা অনুসরণ করুন।
২. উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করলে ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলুন।
৩. প্রয়োজনীয় ওষুধ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, টর্চ ও জরুরি কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন।
৪. জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা থাকলে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো যাচাইবিহীন খবরের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রের তথ্য গ্রহণ করুন।
উপসংহার:
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিছক একটি নাম বেছে নেওয়ার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আবহাওয়া ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশের প্রস্তাবিত নামের তালিকা অনুসরণ করে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের ঘূর্ণিঝড়কে শনাক্ত করা হয়। এর ফলে ঝড়ের বিষয়ে সতর্কবার্তা প্রচার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের নাম যাই হোক না কেন, বিপদের সময় সঠিক তথ্য জানা, সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা এবং আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই জীবন ও সম্পদ রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) এবং ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (IMD)।
