মাকড়সাও কি স্বপ্ন দেখে? ঘুম নিয়ে বিজ্ঞানীদের চমকপ্রদ আবিষ্কার

 

ঘুমন্ত অস্ট্রেলীয় জাম্পিং স্পাইডার Portia fimbriata-এর প্রতীকী ছবি।
ঘুমন্ত অস্ট্রেলীয় জাম্পিং স্পাইডার Portia fimbriata-এর প্রতীকী ছবি।


মানুষের মতো মাকড়সারও কি ঘুমের নির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে? এমনকি ঘুমের মধ্যে তারা কি স্বপ্নও দেখে? সম্প্রতি এক গবেষণায় মাকড়সার ঘুমের ধরন নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বিশেষ প্রজাতির মাকড়সার ঘুমের মধ্যে এমন কিছু আচরণ রয়েছে, যা মানুষের র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (আরইএম) ঘুমের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।


জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা অস্ট্রেলিয়ার জাম্পিং স্পাইডার বা লাফিয়ে চলা মাকড়সা *Portia fimbriata* নিয়ে গবেষণা করে এসব তথ্য পেয়েছেন। ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্সডেইলিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।


** ঘুমের মধ্যে চোখ নড়াচড়া ও পেশির কাঁপুনি


গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রজাতির মাকড়সার ঘুমের দুটি স্বতন্ত্র ধাপ রয়েছে। এর একটি ধাপে তাদের চোখের নড়াচড়া এবং পেশিতে হালকা কাঁপুনি দেখা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে আরইএম ঘুমের সময়ও চোখের দ্রুত নড়াচড়া ও পেশির কিছু কার্যকলাপ লক্ষ করা যায়।


মানুষের ঘুমের এই পর্যায়টি সাধারণত স্বপ্ন দেখার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে মাকড়সার মধ্যে একই ধরনের আচরণ দেখা গেলেও তারা সত্যিই স্বপ্ন দেখে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।


** শিকার ধরতে বেশ কৌশলী এই মাকড়সা


গবেষণায় ব্যবহৃত *Portia fimbriata* আকারে ছোট হলেও শিকার ধরার ক্ষেত্রে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ব্যবহার করে। এরা সাধারণত অন্য মাকড়সা শিকার করে। শিকার ধরতে কখনো কখনো জালে আটকে পড়া পোকামাকড়ের মতো কম্পন তৈরি করে। এতে অন্য মাকড়সা খাবারের আশায় কাছে এলে শিকারি মাকড়সাটি তাকে আক্রমণ করে।


জটিল শিকার কৌশল এবং শেখার ক্ষমতার কারণে এই প্রজাতি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়।


** যেভাবে মাকড়সার ঘুম পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা


মাকড়সাগুলোকে কয়েক দিন ও রাত ধরে পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এ জন্য ব্যবহার করা হয় ইনফ্রারেড ক্যামেরা, যার মাধ্যমে রাতের অন্ধকারেও তাদের আচরণ রেকর্ড করা সম্ভব হয়।


শুধু স্থির হয়ে থাকা আর প্রকৃত ঘুমের মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য গবেষকেরা শব্দের মাধ্যমে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন এবং মাকড়সাগুলোর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর পর তারা পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত বিশ্রাম নেয় কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।


এসব পরীক্ষার ফলাফল থেকে গবেষকেরা ধারণা পান যে মাকড়সার ঘুম কেবল নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয় নয়; বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত জৈবিক প্রক্রিয়া, যার একাধিক ধাপ রয়েছে।


** মাকড়সার মস্তিষ্কের কার্যকলাপ এখনো অজানা


গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মাকড়সার মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ সরাসরি পরিমাপ করতে পারেননি। ফলে তাদের ঘুমের সময় মস্তিষ্কে ঠিক কী ঘটে, তা এখনো অজানা।


গবেষকেরা মূলত চোখের নড়াচড়া, পেশির কাঁপুনি এবং বিভিন্ন আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ঘুমের ধাপগুলো শনাক্ত করেছেন। তাই মাকড়সার মধ্যে মানুষের মতো স্বপ্ন দেখার বিষয়টি এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।


** ঘুমের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন


বিজ্ঞানীদের মতে, এই গবেষণা ঘুমের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এত দিন ঘুমের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে গবেষণার বড় অংশই মানুষ, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখিদের কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে।


কিন্তু মাকড়সার মতো ভিন্ন ধরনের স্নায়ুতন্ত্রবিশিষ্ট প্রাণীর মধ্যেও ঘুমের কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলে তা ঘুমের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।


গবেষকেরা ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন প্রজাতির মাকড়সার ঘুম পর্যবেক্ষণ করতে চান। পাশাপাশি কৃত্রিম আলো, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তন তাদের ঘুমের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেটিও জানার চেষ্টা করবেন।


সব মিলিয়ে গবেষণাটি মাকড়সার ঘুম সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবে মাকড়সা সত্যিই স্বপ্ন দেখে কি না, সেই রহস্যের উত্তর পেতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।


গবেষণার সূত্র: বন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি; সায়েন্সডেইলি, ২৭ অক্টোবর ২০২৬।

মূল প্রতিবেদন